জীবনে চলার পথে এমন অনেক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন অবশ্যই যখন ছোট একটা কাজে অন্যের সাহায্য নিতে হয়েছে বা কাঙ্খিত দক্ষতার অভাবে ছোট একটি কাজে নাকানি চুবানি খেয়েছেন। আপনার যদি এমন অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে কষ্ট পাওয়ার কোন কারণ নেই, গড়পরতা আমাদের সকলেরই এমন অভিজ্ঞতা আছে।
ব্যক্তিগত জীবন বা কর্মজীবন দুই জায়গায় আপনার সফলতা নির্ভর করে আপনার অর্জিত স্কিল বা দক্ষতার উপর। ছাত্রজীবনে আপনি আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে যেসব স্কিল অর্জন করবেন, সেগুলি পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আপনার কাজে আসবে। তাছাড়া এমন অনেক স্কিল আছে যা থাকলে আমরা সহজে নেতিবাচকতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি। তাহলে চলুন এমন কিছু স্কিল সম্পর্কে জানি যেগুলো ছাত্রাবস্থায় অর্জন করা জরুরি।
১। দ্রুত পড়তে পারা (Speed Reading)
বই পড়ার অভ্যাস নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম গুণ। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ সহজেই কোন বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একটি বই পড়ার মাধ্যমে লেখক এর সারা জীবনের অর্জিত জ্ঞান সম্পর্কে জানতে পারি। তবে একুশ শতকে মানুষের কর্ম ব্যস্ততা অনেক বেশি তাই শুধু বই পড়া না দ্রুত বই পড়তে পারা একটি স্কিল হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। যদি কেউ দ্রুত বই পড়তে পারে তাহলে সহজে সে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা ভাবে তৈরি করতে পারবে। কিভাবে দ্রুত বই পড়তে হয় এ ব্যাপারে অনেক বই ও ভিডিও আছে। আমাদের সকলেরই উচিত দ্রুত বই পড়ার দক্ষতা অর্জন করা।
২। ডিপ ওয়ার্ক ( Deep Work)
কোন একটি কাজ কে করল, কত সময় ধরে করল তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই কাজের গুণগত মান। প্রফেশনাল লাইফে কাজের গুণগত মান সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সময়ে মানুষের ডেস্ট্রাকশন অনেক বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেইম ইত্যাদি কারণে কোনো কিছুতে আমরা মনযোগ দিতে পারিনা। এক্ষেত্রে কার্যকর উপায় হল ডিপ ওয়ার্ক স্কিল। ডিপ ওয়ার্ক বলতে সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে কাজ করা বোঝায়। রিপোর্টের মাধ্যমে আমরা কোন কাজের গভীরে প্রবেশ করতে পারি এবং নিখুঁত ভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারি। এতে করে অল্প সময়ে অনেক বেশি গুণগত কাজ করা সম্ভব। ডিপ ওয়ার্ক স্কিল হল কাজের সময় পূর্ণ মনোযোগ কাজে রাখতে পারা। সকল ডেস্ট্রাকশন সৃষ্টিকারী উপাদান চিহ্নিত করে তার কাছ থেকে দূরে থাকা।
৩। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (Long Term Planning)
পরিকল্পনা নিয়ে আমার খুব প্রিয় দুটি প্রবাদ আছে। এক- "যে ব্যাক্তি পরিকল্পনা করতে ব্যর্থ হলো সে ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনা করলো"। দুই- "কোন কাজের পরিকল্পনা সম্পন্ন হলে অর্ধেক কাজ হয়ে যায়"। জীবনে পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সবাই পরিকল্পনা করতে পারেনা। ফলে ভুল পরিকল্পনার কারণে দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়। একটি পরিকল্পনার অনেকগুলো দিক থাকে। সবদিক ভালোভাবে বিবেচনা করে কোন কিছুর পরিকল্পনা করতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। তাইতো আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত কিভাবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হয় সেই স্কিল অর্জন করা।
৪। তথ্য যাচাই-বাছাই করুন (Filtering Info)
অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ (consume over information) বর্তমান সময়ে একটি ব্যাধির আকার ধারণ করেছে। তাছাড়া বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কেউ তার নিজের খেয়াল-খুশি মতো পোস্ট করতেছে। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেনসরিং না থাকায় সহজে মিথ্যা ও ভুল তথ্য সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে এসব প্লাটফর্মে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই বাচাই করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। বর্তমানে মানুষ গড়ে দিনে ৮ ঘন্টা অনলাইনে কাটায়। তাই অনলাইনে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই বাচাই করার স্কিল আবশ্যক। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে না পারলে প্রতিনিয়ত ভুল তথ্য বিশ্বাস করার ফলে আমরা ভুলে-ভরা মানুষ হয়ে যাব।
৫। আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self Discipline)
আত্মনিয়ন্ত্রণ একটি দেশ বা সমাজকে সভ্য করে তোলে। আমার মতে এই গুণ সফলতাকে সহজ করে তোলে। আত্মনিয়ন্ত্রণ এর ফলে আপনি সকল খারাপ কাজ ও বদঅভ্যাস থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবেন। অন্যদিকে আপনার পুরো সময় দক্ষতা অর্জনে ও ক্যারিয়ার গঠনে ব্যয় করতে পারবেন। পূর্বে আলোচিত ডিপ ওয়ার্ক করার জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ খুবই কার্যকরী। আত্মনিয়ন্ত্রণের উপকারিতা -
- গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা যায় সহজে
- বদ অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা যায়
- ক্যারিয়ার গঠনে সহায়ক
৬। ওয়ার্ড প্রসেসিং (Word Processsing)
জীবনে চলার পথে প্রতিনিয়ত আপনাকে ডকুমেন্টেশন করার প্রয়োজন হবে। পড়াশোনা শেষে চাকরির জন্য আবেদন করলে আবেদনপত্র, সিভি, কভার লেটার লিখতে হবে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্ট রাইটিং, অ্যাসাইনমেন্ট ও থিসিস লেখার জন্য মাইক্রোসফট অফিসের দক্ষতা প্রয়োজন। আবার বিশ্ববিদ্যালয় বা অফিস এ নিয়মিত আপনাকে প্রেজেন্টেশন দিতে হয়। তাইতো কিভাবে সুন্দর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানাতে হয় তা জানা আবশ্যক। অন্যদিকে ছোট-বড় যে কোন হিসাব সংরক্ষণ এ আমাদের প্রয়োজন এক্সেল এর দক্ষতা। সর্বোপরি, মাইক্রোসফট অফিস সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা খুবই দরকার।
৭। প্রবন্ধ রচনা (Essay Writing)
স্কুল জীবন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রবন্ধ রচনা বা কোন কিছু লেখা খুবই সাধারণ বাড়ির কাজ। আমাদের শিক্ষক ও অধ্যাপক রা নিয়মিত এ ধরনের কাজ দিয়ে থাকে আমাদের। এই ধরনের লেখার প্রতি বিরক্ত নয় এমন ছাত্র-ছাত্রী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে এই প্রবন্ধ রচনা এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। প্রবন্ধ রচনা শিক্ষার্থীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কোন একটি বিষয় নিয়ে লিখলে ওই বিষয় সম্পর্কে আমরা সহজে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করতে পারি এবং তা সহজে ভুলে যাই না। এছাড়াও আরো অনেক সুবিধা লাভ হবে যদি আমরা প্রবন্ধ রচনা করতে পারি -
- যৌক্তিকভাবে কোন কিছু উপস্থাপন করতে পারব
- সমৃদ্ধ শব্দ ভান্ডার গড়ে ওঠে
- অজানা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ
- চিন্তাশক্তি বিকশিত হয়
- সহজে নিজস্ব কোন আইডিয়া উপস্থাপন করতে পারা
- অন্যদের সাথে সুন্দর যোগাযোগ করতে পারা
৮। ভোকাবুলারি (Vocabulary)
যেকোনো ভাষার উপর আপনার দক্ষতা নির্ভর করে আপনি ওই ভাষার কতগুলো শব্দ জানেন তার ওপর। যে কোন ভাষা ব্যবহার করে কারো সাথে সুন্দর যোগাযোগের জন্য ভোকাবুলারি দরকার। ভোকাবুলারি আমাদের বোঝার সীমাবদ্ধতা দূর করে। বেশি ভোকাবুলারি জানলে আমরা ওই ভাষা লেখা বই থেকে শুরু করে অন্য সকল কিছু বুঝতে পারব। ভোকাবুলারি শেখার আরো কিছু সুবিধা জেনে নেই -
- কার্যকর যোগাযোগ সহজ হয়
- সহজে কোনো কিছু উপস্থাপন সম্ভব হয়
- সহজে কোনো কিছু বুঝতে পারি
- সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভাবে কোন কিছু লেখা
৯। অর্থ ব্যবস্থাপনা ( Personal Finance)
খুব সম্ভবত অর্থ ব্যবস্থাপনার কথা শুনে আপনার চোখ কপালে উঠে গেছে! ভাবছেন আমি কেন এসবের স্কিল শিখব। এসব তো হিসাব বিজ্ঞান বা ফাইন্যান্স বিভাগের ছাত্র ছাত্রীরা শিখবে। তবে একুশ শতকে অর্থ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা সকলের জন্য দরকার। আপনাকে গোটা জীবন অর্থ নিয়ে কাজ করতে হয়। মানুষের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেক কিছু বর্তমানে অর্থ ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত আয় করার পরও অর্থ ব্যবস্থাপনা না জানার কারণে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তাই ছাত্র অবস্থায় থেকেই আপনাকে অর্থ ব্যবস্থাপনা স্কিল অর্জন করতে হবে। অর্থ ব্যবস্থাপনা মধ্যে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত -
- ক্রেডিট কার্ডের সচেতন ব্যবহার, বেশি খরচ করে না ফেলা
- আয়ের কিছু অংশ সঞ্চয় করা
- অল্প পরিমাণ হলেও বিনিয়োগ করা
- চাকরি না থাকলে দুই অথবা তিন মাসের ব্যয় সমতুল্য অর্থ মজুত রাখা।
১০। সময়ানুবর্তী (Punctuality)
আধুনিক সভ্য সমাজে সময়ানুবর্তিতার গুণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ব্যক্তিগত গুণাবলী মধ্যে সময়ানুবর্তিতার গুনকে অনেক বেশি মর্যাদা দেয়া হয়। আপনি সময়ের কাজ সময়ে করলে বা কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে সময়মতো তা পালন করলে সবার কাছে আপনার একটি নিজস্ব পরিচয় গড়ে উঠবে। সময়ানুবর্তী গুণের মাধ্যমে আপনি আপনার সময় এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবেন। অন্যদের তুলনায় বেশি কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন এবং কাজে মনোযোগ বেশি থাকবে। এছাড়াও সময়ানুবর্তিতার অন্যান্য সুবিধা গুলো হল -
- অধিক প্রডাক্টিভ হওয়া
- মানসিক চাপ কমে যাওয়া
- জীবনে কাজ ও সময়ের ভারসাম্য অর্জন
- জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন
- অন্যের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন
ছাত্র অবস্থা হল কর্মজীবনের প্রস্তুতির সময়। এ সময় যে যত বেশি সময় বিভিন্ন স্কিল অর্জনে ব্যয় করতে পারবে, পরবর্তী জীবনে সে ততো বেশি সুবিধা পাবে। তাই আমাদের সকলেরই উচিত আমাদের জন্য দরকারি সব স্কিল এর তালিকা তৈরি করা এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেইসব স্কিল এ দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে সকল স্কিল সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। নিজের কাছে যে স্কিল গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় সেগুলো অর্জনে কাজ করাই শ্রেয়।





